Powered By Blogger

রবিবার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

লালন স্মরণ উৎসব (তিরোধানের চল্লিশদিন)


"ডানে বেদ, বামে কোরান,
মাঝখানে ফকিরের বয়ান,
 যার হবে সেই দিব্যজ্ঞান
 সেহি দেখতে পায়" -

সেই দিব্যজ্ঞান লাভের আশায় সাঁই জির ডাকে আমরা ছুটে যায় "সাধুসঙ্গে"। ২৪শে নভেম্বর ২০১১ হুমায়ুন সাধুর আখড়া বাড়ি, খানা বাড়ি, রায়পুরা, নরসিংদি। এবারের সাধুসঙ্গ পড়েছে বৃহঃস্পতিবার, পরদিনই আমাদের ছুটির দিন। বিবাহিত জীবনের কিছু পিছুটান ছিল, তাই একটু Confuse ছিলাম। তারপরও Confirm ছিলাম যাচ্ছি।

২৪ নভেম্বর  বৃহঃস্পতিবার সন্ধ্যায় আমি, সাগর মেজবাহ, ভুলোমনা শাহাদাত, যুদ্ধাহত তুষার ও মারুফ রওনা দিলাম খানাবাড়ি, নরসিংদির উদ্দেশে। বনানী থেকে যাত্রা করা আমাদের বাস কখনো যানজটে আটকে থাকে, কখনো চলে সাবলীল গতিতে। এভাবে আমরা যখন নরসিংদি বাজারে এসে থামি, তখন রাত ৯:১১ মিনিট।  স্থানীয় একটা কনফেকশনারি থেকে রুটি মুড়ি আর ৪ লিটার পানি কিনে রওনা হলাম আরশিনগরের উদ্দেশ্যে।

আমি জানি না, এটাই সাঁই জির গানের – “বাড়ির পাশে আরশিনগর...” এর সেই আরশিনগর কিনা? যাই হোক অটো বাইকে চড়ে আমরা আরশিনগর পৌঁছালাম। তখন রাত ৯:২০ বাজে। খানাবাড়ি যাওয়ার টেম্পু পাওয়ার কথা, কোন টেম্পু নাই। বেশ কিছু লোক দাঁড়িয়ে আছে, সবাই খানাবড়ি যাবে এবং হুমায়ুন সাধুর বাড়ির লালন মেলায় যাবে।
এক অতি উৎসাহী লোক –
ভাই, আপনারা কি  হুমায়ুন সাধুর বাড়ি যাবেন? কয়জন আপনারা? আমি একটা গাড়ি আনতাছি, আমিও যাবো গুরুর বাড়ি। আমরা একটা নিশ্চত আশ্বাস পেলাম। ওই লোককে নিয়ে চা খেলাম।



তুষার ও সাগর চা পানে ব্যস্ত।
 এই সেই গাড়ি যাটাতে আমরা গিয়েছিলাম খানা বাড়ি পর্যন্ত। আমরা পাঁচজন ঢাকা থেকে গেছি, টেম্পুর বাকীরা নারায়নগঞ্জ থেকে এসেছে। গাড়িতে উঠে আমাদের উপলব্ধি হলো যে লোকটি আমাদের জন্য টেম্পু ব্যাবস্থা করলো উনি একজন Broker টাইপ মানুষ। সাধুভক্ত টক্ত সবই ছিল তার নাটক।

প্রতি বছরই  এখানে বেশ বড় আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় দুদিনব্যাপী লালন শাহ এর চল্লিশা উপলক্ষে সাধুসঙ্গ। প্রায় চল্লিশ মিনিট টেম্পুতে চলার পর আমরা খানাবাড়ি ষ্টেশন এ পৌঁছালাম। রাত সাড়ে দশটা, রেল লাইনের পাশ দিয়ে আমাদের কাফেলা চলছিল লালন উৎসবের দিকে। আকাশে চাঁদ দেখা যাচ্ছিল না, তবে  সারা আকাশ তাঁরায় ঢাকা। কুয়াশার ফলে আশপাশে রহস্যময় অন্ধকারে ছেয়েছিল। আমাদের আশঙ্কা আজ সারারাত আর চাঁদের দেখা মিলবে না। কানে গানের আওয়াজ আসছে, কিছুক্ষণের মধ্যেই  আমাদের চোখে পড়ে কিছুটা সামনেই আলো। বুঝতে পারি ওটাই হুমায়ুন সাধুর আখড়া বাড়ি।


২.
জ্বলজ্বলে আলোর মতো মানুষের কলকাকলিতে মুখর পুরো হাট। লালনের গানের প্রেমে নরসিংদি, ঢাকা, কুষ্টিয়া, নারায়নগঞ্জ, মাগুরা, পাবনা এবং দেশের নানা জায়গার হাজারো হাজারো লালনভক্ত ও অনুসারীদের পদচারণায় মুখর হুমায়ুন সাধুর আখড়া বাড়ির সাধুসঙ্গ ।

ছোট ছোট কুপিতে আলো জ্বালিয়ে জিলিপি, সন্দেশ, চটপটিসহ বিভিন্ন ঝাল-মিষ্টি খাবারের দোকান নিয়ে বসেন দোকানিরা। বসে চুরি-ফিতা-লিপস্টিক, ছোটদের বিভিন্ন খেলনা বা শাড়ি, লুঙ্গির দোকান। আখড়া বাড়ির ঘরে চলছে লালনের গান। ঝাকড়া চুলের বাউলরা কেউ একতারা হাতে, কেউ এমনিতেই কথা বলছিলেন নিজেদের মধ্যে।

আমরা প্রধান ফটক পেড়িয়ে সোজা পেছন ফটক দিয়ে বের হয়ে গেলাম। আগে পেট পুজা দিতে হবে, রাতের খাবার খেয়ে আমরাও মিশে যাবো বাউল ফকিরদের সাথে প্রানে প্রান লাগিয়ে।

ডিম ভাজায় ব্যস্ত প্রবীর সুমন।

খাওয়া দাওয়া শেষ করে আমরা ঠিক একটু সাইডে একটা জোড়া পুকুর আছে, এর মাঝে চাদর গায়ে দিয়ে বসে ভাবছি -  এত লোক (?) হাল্কা হলে ভিতরের দিকে যাবো। এর মধ্যে আমাদের সাথে যুক্ত হলো কাঙ্গাল শিপন ভাই। সুমন বলল, আমি একটা চক্কর দিয়ে আছি। কিছু সময় পর সুমন কল করে বলল – আনু দি চলে আসছে। স্টেজে অবস্থান করছে। আমরা আর দেরি না করে যখন স্টেজের দিকে এগুচ্ছি তখন – শুনলামঃ আপনাদের সামনে সাইজির গান নিয়ে আসছেনঃ আনুশেহ আনাদিল। আমাদের গতি বেড়ে গেলো। গিয়ে দাঁড়ালাম এক ফাকে। সবাই যেন – যার যা আছে তাই নিয়ে ঝাপিয়ে পরেছে...মানে ক্যামেরা, মোবাইল।
ইতমধ্যে গুরু আনুশেহ কিছু গুরু বাক্য বিনিময় শেষ করেই, গাইলেন –
“আছে ভবের তালা যেই ঘরে
 সেই ঘরে সাঁই বাস করে”

তারপর একে একে সে যে হবার কথা, আপন বেগে আপনি চলি। গান শেষে যার নাম ঘোষনা হলো তিনি হলেন আমার পরম শ্রদ্ধার গুরু কাঙ্গালিনী সুফিয়া।
শুরুতে বললেন – আমার শরীরটা ভালো না। আমি মাত্র চিকিৎসা থেকে ফিরেছি। হয়তো চলেই যেতাম আপনাদের মাঝ থেকে। বললেনঃ আমি বাসায় ছিলাম, আমার মেয়ে আনুশিয়া আমাকে বলল “মা, চলেন যায়”। আর আমিও চলে এলাম। বলে শুরু করলেন – এ বড় আজব কুদরতি, আঠারো মুকামের মাঝে জ্বলছে একটা রূপের বাতি। এই বয়সে তিনি যে গান পরিবাশন করলেন তা সত্যি অবাক করার মত। এর পর তিনি আনুশেহ এর অনুরোধে গাইলেন – বাড়ির পাশে আরশিনগর...। গান শেষ হতেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পরেন। এই বয়সে এই দরদ তাঁর গানের প্রতি। তিনি রেষ্টে চলে যান। মঞ্চে আবার আছে আনুশেহ “আল্লাহ বল মনরে পাখি, মওলা বল মনরে পাখি”। এ যেন কাঙ্গালিনী সুফিয়ার জন্য প্রার্থনা । আমরা আনুশেহ আনাদিল কে এই রুপে কখনো পাইনি। এক কথায় এ যেন হাজার বছরের মধ্যে একটা সেরা Performance ছিল। তাঁর গানে যে প্রেম, যে গভীরতা তা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। জয় গুরু! জয় গুরু!! বলে চীৎকার করেছি। আনুশেহ এর গানের সাথে পান্ডুর Guitar mixing আর সফি মন্ডলের কোরাস উফ!! পাগল করা। জটিল।  সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো গান শুনলাগলাম।
 
একে একে টুনটুন শাহ, সফি মন্ডল, সাধু গুরু হুমায়ুন ফকির, মওলা পাগলা, বাউল খায়রুল বাশার, উস্তাদ হুমায়ুন সহ প্রায় পঞ্চাশ জন বাউল ফকির সারাতে প্রায় একশত গান পরিবেশন করেন। বাউলরা লালনের প্রচলিত গান ছাড়াও অনেক অপ্রচলিত গানও পরিবেশন করেন। রাত বাড়ার সাথে সাথে যেন উপস্থিত ভক্তদের ভাবও বাড়তে থাকে। গানের ফাঁকে ফাঁকে উপস্থাপক গানের মর্মবাণী সম্পর্কে ব্যাখ্যা করেন। শ্রোতারা যার গাওয়া গান বেশি পছন্দ করেন তাকে বকশিস দেন, তাকে বার বার গাইতে অনুরোধ করেন। 



প্রত্যেক গায়কই লালনের প্রতি গভীর ভক্তি নিয়ে গান পরিবেশন করেন। গানে গানে যখন সারা হুমায়ুন সাধুর আখড়া বাড়ই লালনে মত্ত, তখন আমরা নিজেদের মধ্যে বিস্ময় প্রকাশ করি লালনের গানের গভীরতা নিয়ে। আমরা অনুভব করার চেষ্টা করি লাখ লাখ ভক্তকে ধর্ম  -বর্ণ-শ্রেণীভেদে লালন কীভাবে আজও মাতিয়ে রেখেছেন। আমরা   মন্ত্রমুগ্ধের মতো লালনের বাণীর মধ্যে খুঁজে বেড়াই নিজেদের মধ্যে!
আমি -
‘কোথায় পাবো তাঁরে - আমার মনের মানুষ যেঁরে।
 হারায়ে সেই মানুষে- তাঁর উদ্দেশে
 দেশ বিদেশে বেড়াই ঘুরে \’

(এই গানটি গেয়েছিল-ফকির লালন শাহের ভাবশিষ্য গগন হরকরা। যার আসল নাম বাউল গগনচন্দ্র দাস।)
https://www.facebook.com/note.php?note_id=307503055934479

চল যায় আনন্দের বাজারে


















লালন স্মরণোৎসব 
স্থানঃ ছেঁউড়িয়া, কুষ্টিয়া।
সময়ঃ ১লা কার্তিক থেকে ৩রা কার্তিক ১৪১৯। [16th-18th October]
উপলক্ষ্যঃ ফকির লালন সাঁইজীর তিরোধান দিবস।






















লালন স্মরণোৎসব
স্থানঃ হুমায়ুন সাধুর আখড়া বাড়ি, খানা বাড়ি, রায়পুরা, নরসিংদি 
সময়ঃ ২৪-২৫ নভেম্বর,১০ অগ্রহায়ণ
উপলক্ষ্যঃ লালন সাইজির তিরোধানের (১ লা কার্তিক) ঠিক চল্লিশ দিন পর এই সাধুসঙ্গ উৎযাপন করে সাধুগুরু হুয়মায়ুন সাধু তার নিজ বাড়িতে। প্রতি বছরই এখানে বেশ বড় আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় দুদিনব্যাপী এই সাধুসঙ্গ।



















লালন সাঁই বটতলা সাধুসঙ্গ 
সময়ঃ নভেম্বর ২৯-৩০ ১৫-১৬ ই অগ্রহায়ন ১৪১৯
স্থানঃ পদ্মহেম ধাম, লালন সাঁই বটতলা, দোসর পাড়া, সিরাজদিখান, মুন্সিগঞ্জ, বাংলাদেশ।  
উপলক্ষ্যঃ লালন স্মরন উৎসব। এটা একটা ব্যক্তিগত পরজায়ের উদ্দ্যোগ। ওখানে লালনগীতি বিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। প্রতি বছরই এখানে বেশ বড় আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় দুদিনব্যাপী এই সাধুসঙ্গ।দেশি বিদেশী লালন সঙ্গীত শিল্পিরা আসেন এই সাধুসঙ্গে। 






















লালন স্মরণোৎসব
৩ দিনব্যাপি সাধুর বাজারের বার্ষিক অনুষ্ঠান।
সময়ঃ ৩০ চৈত্র, ১, ২, ফাল্গুন ১৪১৯ বাংলা, ১৪, ১৫, ১৬ মার্চ।
স্থানঃ ফকির খালেক সাইয়ের আখড়াবাড়ি, লোহাগাছিয়া, গাজীপুর।
আয়োজনেঃ ফকির খালেক সাইয়ের সাধুর বাজার আখড়াবাড়ির ভক্তবৃন্দ।




☆ ১৩, ১৪ই ফেব্রুয়ারি মরমী সাধক দূরবীন শাহ্‌'র বাৎসরিক ওরস ছাতকের দূরবীন টিলায়।
☆ ১৫, ১৬ই ফেব্রুয়ারি বাউল সম্রাট শাহ্‌ আবদুল করিম লোক উৎসব। সুনামগঞ্জের ধলগ্রামে।